ব্রেকিংঃ

একজন অনন্য তোফায়েল আহমেদ।।

মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) গোটাদিন সচিবালয়ে ছিলাম, ভিআইপিদের জন্য ঢাকার সড়কে আলাদা লেনের প্রস্তাব বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে। তো সচিবালয়েই দেখা মিললো এক অনন্য ভিআইপির। তিনি তোফায়েল আহমেদ। এই সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী। যার রাজনৈতিক ইতিহাস বাংলাদেশের সমান বয়সী।

তখন দুপুর ২টা। কিছুক্ষণ আগেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ চা বোর্ড ও চীনের চাইনিজ একাডেমি অব এগ্রিকালচার সায়েন্সেস- এর মধ্যে একটা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। সে বিষয়ে তথ্য নিয়ে আমরা দুই সংবাদকর্মী (আমি ও চ্যানেল আইয়ের মোরছালিন বাবলা ভাই) লিফটে উঠে পড়লাম, চারতলা থেকে নীচে নামবো বলে।

এমন সময় লিফটম্যান ছুটে এলেন, বললেন- স্যার দয়া করে একটু নামেন… মন্ত্রী মহোদয় যাবেন।

মন্ত্রী মহোদয় গেলে লিফট ছেড়ে দিতে হবে এটাই স্বাভাবিক ভব্যতা। আমরা নেমে গেলাম।

একটুক্ষণেই মন্ত্রী মহোদয় বের হয়ে এলেন এবং লিফটে উঠলেন। আমরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। লিফট চলে গেলো।

গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু হলো না।

আমরা তখন লিফট ফিরে আসার অপেক্ষায়। দেখলাম একজন পুলিশ সদস্য সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে উপরে এসেছেন। এসে ডাকতে লাগলেন, দুইজন সাংবাদিককে নাকি লিফটম্যান মন্ত্রী মহোদয়কে নেয়ার জন্য নামিয়ে দিয়েছেন। ওই সাংবদিকের সাথে কথা বলার জন্য মন্ত্রী মহোদয় লিফটের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। কারা ওই দুই সাংবাদিক।

বিষয়টি বুঝে উঠার আগেই নীচ থেকে লিফট চলে এল। আমরাও নেমে এলাম।

নেমে দেখি তখনো বাণিজ্যমন্ত্রী লিফটের দরজায় দাঁড়িয়ে।

লিফট থেকে নামার সাথে সাথে তিনি আমার কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, লিফটম্যান আপনাদের নামিয়ে দিয়েছে, বিষয়টা আমি নামার পর বুঝতে পেরেছি। তাই আমি গাড়িতে না উঠে এখানেই দাঁড়িয়ে আছি। আপনাদের সাথে কথা বলার জন্য।

এমন পরিস্থিতিতে কী অভিব্যক্তি দিতে হয় তা আমার জানা ছিলো না।

মন্ত্রী মহোদয় বললেন, আমি এটা কখনো করি না। কারণ আমি জমিদার না, আমি রাজা না। আমি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছি।

তখনো তাঁর একটি হাত আমার কাঁধে। বললেন, আজ আমি মন্ত্রী আছি, কাল নাও থাকতে পারি। ক্ষমতা ও সম্মান আল্লাহর দেয়া। এই ধরনের কাজ অন্যায়, এটা লিফটম্যানের মোটেও উচিত হয়নি। আপনারা কিছুমনে করবেন না।‘

আমরা সংবাদকর্মীরা জানি, তোফায়েল আহমেদ সব সময় সাংবাদিকদের কাছের মানুষ মনে করেন। সময় পেলেই খোলা মনে কথা বলেন।

মন্ত্রী বললেন, আপনারা আমার ভাই। আমি সব সময় সাংবাদিকদের আমার পরিবারের সদস্য মনে করি।

একজন সাংবদিক হিসেবে এই ঘটনায় অত্যন্ত সম্মানবোধ করছিলাম। সে সঙ্গে মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা আগের থেকেও আরো বহুগুণ বেড়ে গেল।

মনে হচ্ছিল, এমন একটি আচরণ তার মত আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদের পক্ষেই কেবল সম্ভব।

দেশবাসীর কাছে তোফায়েল আহমেদকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। তিনি একাধারে সাবেক ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ডাকসুর সাবেক ভিপি এবং বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যএবং সর্বোপরি তিনি একজন মাটি ও মানুষের নেতা।

তবে এই দিন চেনা হলো একজন অনন্য তোফায়েল আহমেদকে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরো কিছু ব্যক্তিগত কথা, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের দুজনের সাথে গল্প করলেন সেখানে দাঁড়িয়ে। এরপর এগিয়ে গাড়িতে উঠলেন।গাড়িতে উঠেও জানালা খুলে আবারও কথা বলে বিদায় নিলেন।

তোফায়েল আহমেদ বলেই এতটা সম্ভব। ধন্যবাদ মাননীয় মন্ত্রী আপনাকে।

মনে মনে ভাবলাম, ভিআইপিদের জন্য রাজধানীর সড়কে আলাদা লেনের প্রস্তাব হয়েছে। কিন্তু আমাদের এই ভিআইপি তো লিফটটাকেই আলাদা করতে চান না। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীকে বাদ দিলে, তিনি নিঃসন্দেহে দেশের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ভিআইপি।

-গোলাম সামদানী